কারবালার মহাকাব্য: হযরত হোসাইন (আ.)-এর আত্মদান ও হকের চিরন্তন মহাবিজয়

মোঃ শফিকুল ইসলাম প্রিয়
0
কারবালার মহাকাব্য: হযরত হোসাইন (আ.)-এর আত্মদান ও হকের চিরন্তন মহাবিজয়

বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম। আলহামদুলিল্লাহি রাব্বিল আলামিন, ওয়াস-সালাতু ওয়াস-সালামু আলা সাইয়্যিদিনা মুহাম্মাদিন ওয়া আহলুল বাইয়েতীত তাইয়্যিবিনাত তাহিরিন, আল-মাসুমিন।
আহলুল বাইত (আ.)-এর পবিত্র নূরানি চশমা দিয়ে যখন আমরা কারবালার ইতিহাসের দিকে তাকাব, তখন সেখানে কোনো হাহাকার, হতাশা বা পরাজয়ের গ্লানি দেখতে পাব না। আহলুল বাইতের দৃষ্টিতে কারবালা হলো ‘আশেক’ ও ‘মাশুক’-এর (বান্দা ও আল্লাহর) মধ্যকার প্রেমের এক চরম পরাকাষ্ঠা, যেখানে তলোয়ারের ওপর রক্তের এবং আপাত ক্ষণস্থায়ী পরাজয়ের ওপর চিরন্তন আদেশিক বিজয়ের এক মহাকাব্য রচিত হয়েছে।
নিচে এই কালজয়ী বিজয়ের প্রবন্ধটি উপস্থাপন করা হলো:
 ১। বিজয়ের স্বর্গীয় পরিমাপঃ আহলুল বাইতের দৃষ্টিতে
লৌকিক দৃষ্টিতে বিজয় মানেই হলো প্রতিপক্ষকে সমূলে বিনাশ করে সিংহাসন দখল করা। কিন্তু আহলুল বাইতের নিখাদ তাওহীদি দর্শনে বিজয় হলো আল্লাহর ইচ্ছার সামনে নিজের ইচ্ছাকে সম্পূর্ণরূপে বিলীন করে দেওয়া। ইমাম হোসাইন (আ.) মক্কা থেকে কুফার উদ্দেশ্যে রওনা হওয়ার সময় তাঁর ঐতিহাসিক অসিয়তনামায় স্পষ্ট করে দিয়েছিলেন তাঁর এই যাত্রার প্রকৃত উদ্দেশ্য কী। তিনি লিখেছিলেনঃ
إِنَّمَا خَرَجْتُ لِطَلَبِ الإِصْلاَحِ فِي أُمَّةِ جَدِّي (ص)
(ইন্নামা খারাজতু লিতলাবিল ইসলাহি ফী উম্মাতি জাদ্দী)
অর্থ: "আমি কেবল আমার নানাজানের উম্মতের সংশোধনের উদ্দেশ্যে বের হয়েছি।"
তিনি আরও স্পষ্ট করে বলেনঃ
أُرِيدُ أَنْ آمُرَ بِالْمَعْرُوفِ وَأَنْهَى عَنِ الْمُنْكَرِ
(ইউরীদু আন আমুরা বিল মা'রূফি ওয়া আনহা 'আনিল মুনকার)
অর্থ: "আমি সৎকাজের আদেশ দিতে এবং অসৎকাজ থেকে নিষেধ করতে চাই।"
যেহেতু ইমাম হোসাইন (আ.)-এর উদ্দেশ্য ক্ষমতা ছিল না, বরং দ্বীনের সংস্কার ও পুনরুজ্জীবন ছিল—তাই শাহাদাতের মাধ্যমে সেই দ্বীন রক্ষা পাওয়ার অর্থই হলো ইমামের চূড়ান্ত বিজয়।
২। কারবালা কোনো পরাজয় নয়ঃ ‘জামালে এলাহী’ বা ঐশ্বরিক সৌন্দর্য
ইমাম হোসাইন (আ.)-এর শাহাদাতের পর আহলুল বাইতের নারীদের যখন বন্দি করে কুফায় উবায়দুল্লাহ ইবনে জিয়াদের দরবারে আনা হয়, তখন সেই অহংকারী জালিম ইমাম-কন্যা হযরত জয়নাব (সা.আ.)-কে উপহাস করে বলেছিল, "তুমি দেখলে আল্লাহ তোমার ভাই আর আহলুল বাইতের সাথে কী করলেন?"
তখন কারবালার সিংহী, আলী-কন্যা হযরত জয়নাব (সা.আ.) যে ঐতিহাসিক উত্তর দিয়েছিলেন, তা আহলুল বাইতের সমগ্র দৃষ্টিভঙ্গিকে স্পষ্ট করে দেয়। তিনি জিয়াদকে স্তব্ধ করে দিয়ে বলেছিলেনঃ
مَا رَأَيْتُ إِلاَّ جَمِيلاً
(মা রাআইতু ইল্লা জামীলা)
অর্থ: "আমি (কারবালায়) সৌন্দর্য ছাড়া আর কিছুই দেখিনি!"
তিনি তাঁর বক্তব্যের সমর্থনে যুক্ত করে বলেনঃ
هَؤُلاءِ قَوْمٌ كَتَبَ اللَّهُ عَلَيْهِمُ الْقَتْلَ فَبَرَزُوا إِلَى مَضَاجِعِهِمْ
(হাউলাই কাওমুন কাতাবাল্লাহু আলাইহিমুল কাতলা ফাবারাজূ ইলা মাদ্বাজিয়িহিম)
অর্থ: "এরা এমন এক দল মানুষ ছিলেন যাদের ভাগ্যে আল্লাহ শাহাদাত লিখে রেখেছিলেন, তাই তাঁরা বীরের মতো নিজেদের আরামগাহের (শাহাদাতগাহের) দিকে এগিয়ে গেছেন।"
আহলুল বাইতের কাছে আল্লাহর রাস্তায় নিজের জীবন ও পরিবার বিলিয়ে দেওয়া কোনো ট্র্যাজেডি বা পরাজয় নয়, বরং তা আল্লাহর প্রেমের সর্বোচ্চ ও সুন্দরতম প্রকাশ (جميل)।
 ৩। ইমাম হোসাইন (আ.)-এর আধ্যাত্মিক বিজয় ও রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর বাণী
আহলুল বাইতের চতুর্থ ইমাম, হযরত জয়নুল আবেদীন (আ.)-কে কারবালার রক্তক্ষয়ী ঘটনার পর এক ব্যক্তি প্রশ্ন করেছিল, "হে রাসুলের সন্তান! এই যুদ্ধে শেষ পর্যন্ত জয়ী হলো কে?" ইমাম জয়নুল আবেদীন (আ.) অত্যন্ত প্রজ্ঞার সাথে উত্তর দিয়েছিলেন: "যখন নামাজের সময় হবে এবং আজান ও একামত দেওয়া হবে, তখন তুমি নিজেই বুঝতে পারবে বিজয়ী কে হয়েছে।"
অর্থাৎ, ইয়াজিদ চেয়েছিল রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর নাম ইসলামের খাতা থেকে মুছে দিতে। কিন্তু ইমাম হোসাইনের আত্মত্যাগের কারণেই আজো আজানে 'আশহাদু আন্না মুহাম্মাদার রাসুলুল্লাহ' ধ্বনিত হয়। রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সেই বিখ্যাত বাণী আজো এর সত্যতা প্রমাণ করেঃ
حُسَيْنٌ مِنِّي وَأَنَا مِنْ حُسَيْنٍ
(হুসাইনুন্ মিন্নী ওয়া আনা মিন হুসাইন)
অর্থ: "হোসাইন আমার থেকে এবং আমি হোসাইন থেকে।"
নবীজি (সা.)-এর এই কালজয়ী বাণীর গূঢ় অর্থই হলো—নবীজির মাধ্যমে ইসলামের জন্ম হয়েছে, আর হোসাইনের কোরবানির মাধ্যমেই সেই ইসলাম কেয়ামত পর্যন্ত টিকে থাকার জীবনশক্তি পেয়েছে।
 ৪। ‘লা ইলাহা’র অবিনশ্বর ভিত্তি
আহলুল বাইতের দৃষ্টিতে কারবালার ময়দান ছিল একটি চিরন্তন পরীক্ষাগার। ইমাম হোসাইন (আ.) তাঁর ছয় মাসের দুগ্ধপোষ্য শিশু আলী আসগর থেকে শুরু করে যুবক পুত্র আলী আকবর এবং ভাই আব্বাসসহ প্রিয়জনদের কোরবানি দিয়ে আল্লাহর দরবারে যে মোনাজাত করেছিলেন, তা-ই ছিল তাঁর বিজয়ের দলিল। তলোয়ারের আঘাতে ক্ষতবিক্ষত হয়ে যখন তিনি কারবালার তপ্ত বালুর ওপর সিজদাবনত, তখন তাঁর জবান থেকে নিঃসৃত হচ্ছিল:
إِلَهِي رِضًى بِقَضَائِكَ، تَسْلِيماً لِأَمْرِكَ
(ইলাহী রিদ্বান বিক্বাদ্বায়িকা, তাসলীমান লিআমরিকা)
অর্থ: "হে আমার আল্লাহ! আমি তোমার ফয়সালাতেই সন্তুষ্ট এবং তোমার আদেশের সামনে সম্পূর্ণ আত্মসমর্পণকারী।"
সিংহাসনে আসীন ইয়াজিদ ইমামের শরীরকে টুকরো টুকরো করতে পেরেছিল, কিন্তু ইমামের এই অটল ঈমান ও সমর্পণকে বিন্দুমাত্র স্পর্শ করতে পারেনি। ইয়াজিদ আজ ইতিহাসের সবচেয়ে ঘৃণিত ও অভিশপ্ত নাম, আর হোসাইন (আ.) হলেন পৃথিবীর প্রতিটি মুক্তিকামী মানুষের হৃদয়ের স্পন্দন।

আহলুল বাইতের পবিত্র চিন্তাধারায় কারবালা হলো 'ফাতহুল মুবীন' বা সুস্পষ্ট বিজয়। ইমাম হোসাইন (আ.) যদি কারবালার মরুপ্রান্তরে নিজের পবিত্র রক্ত ঢেলে না দিতেন, তবে উমাইয়াদের তৈরি করা বিকৃত ও ভোগবাদী রাজতন্ত্রই আজকের 'ইসলাম' বলে গণ্য হতো।
ইমাম হোসাইন (আ.) বাহ্যিক ও সাময়িক পরাজয়ের গ্লানিকে নিজের কাঁধে তুলে নিয়ে ইসলামের আত্মাকে চিরদিনের জন্য স্বাধীন করে দিয়ে গেছেন। তাই কারবালা কোনো ক্রন্দন বা বিলাপের সাধারণ ট্র্যাজেডি নয়; কারবালা হলো বাতিলের অন্ধকারের বিরুদ্ধে হকের নূরের এক মহিমান্বিত ও চিরন্তন মহাবিজয়।
”এই লেখাটির মেধাস্বত্ত সম্পুর্ণ লেখক কর্তৃক সংরক্ষিত, লেখকের অনুমতি ছাড়া এই লেখার অংশ বিশেষ বা সম্পূর্ণাংশ অন্য কোন মিডিয়াতে প্রকাশ করা আইনত দন্ডনীয় অপরাধ হিসাবে গন্য হবে।”

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ

আপনার মূল্যবান মতামত দিন। আমরা আপনার কমেন্টের অপেক্ষায় আছি! দয়া করে গঠনমূলক মন্তব্য করুন এবং কোনো স্প্যাম বা বিজ্ঞাপন লিংক শেয়ার করবেন না।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন (0)
3/related/default